বীজবিহীন লেবু চাষ করে প্রতি মাসে আয় ৩ লাখ টাকা, জানুন কিভাবে সম্ভব?

বিভিন্ন জাতের লেবুর মধ্যে অন্যতম একটি জাত হচ্ছে সিডলেস বা বীজবিহীন লেবু। উৎপাদন খরচ কম ও অল্প সময়ে অধিক ফলন পাওয়ায় বর্তমানে অনেক চাষি গড়ে তুলছেন লেবুর বাগান। সঠিক নিয়ম মেনে লেবু চাষে মিলবে শতভাগ সফলত। কোন মাটিতে কী পদ্ধতিতে লেবু চাষ করলে ভালো ফলন হবে এটা জানা যেমন জরুরি ঠিক তেমনি পরিমাণ মতো সব উপকরণও দিতে হবে।

পাঠক আসুন জেনে নেয়া যাক, লেবু চাষের সঠিক পদ্ধতি।

মাটি: হালকা দোআঁশ ও নিষ্কাশন সম্পন্ন মধ্যম অম্লীয় মাটিতে লেবু ভাল হয়।

রোপণ পদ্ধতি: গুটি কলম ও কাটিং তৈরি করে মধ্য-বৈশাখ থেকে মধ্য-আশ্বিন (মে-সেপ্টেম্বর) মাসে ২.৫*২.৫ মিটার দূরত্বে রোপণ করা হয়।

সারের নাম/সারের পরিমাণ/গাছ পতি: ইউরিয়া ৪৫০-৫৫০গ্রাম, টিএসপি ৩৭৫-৪২৫ গ্রাম, এমপি ৩৭৫-৪২৫ গ্রাম, গোবর ১৫-২০ কেজি।

সার প্রয়োগ পদ্ধতি: প্রথম কিস্তি মধ্য-ভাদ্র থেকে মধ্য কার্তিক (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) মাসে, ২য় কিস্তি মধ্য মাঘ-মধ্য ফাল্গুন (ফেব্রুয়ারি) মাসে এবং ৩য় কিস্তি মধ্য-জ্যৈষ্ঠ থেকে মধ্য-আষাঢ় (জুন) মাসে প্রয়োগ করতে হবে।

অঙ্গ ছাঁটাই: প্রতি বছর মধ্য-ভাদ্র থেকে মধ্য-কার্তিক (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) মাসে গাছের অবাঞ্ছিত শাখা ছাঁটাই করতে হবে।

পানি সেচ ও নিষ্কাশন: খরা মৌসুমে ২-৩ বার সেচ প্রয়োগ করা দরকার। জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না বিধায় বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাতের সময় গাছের গোড়ায় যাতে পানি না জমে সে জন্য নালা করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।

অন্যান্য পরিচর্যা: লেবুর প্রজাপতি পোকা দমন: এ পোকার কীড়া পাতা খেয়ে ফেলে। এ জন্য ফলন ও গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।

প্রতিকার: ১. ডিম ও কীড়াযুক্ত পাতা সংগ্রহ করে মাটির নিচে পুঁতে বা পুড়ে ফেলতে হবে। ২. ডাইমেক্রন ১০০ ইসি ১ মিলি অথবা সেভিন ৮৫ এসপি ১ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ১০-১৫ দিন পর পর প্রয়োগ করতে হবে।

বাগানে লেবু উৎপাদন বাড়ানো কৌশলঃ

বাংলাদেশে টক জাতীয় ফলের মধ্যে লেবু অন্যতম জনপ্রিয়। লেবুর রস ভাত, তরকারি, ডাল প্রভৃতিতে, রোগীর পথ্যে এবং শরবত ও নানা পানীয় প্রস্তুতে ব্যবহার করা হয়। লেবুর রসে প্রচুর পরিমাণ সাইট্রিক এসিড থাকায় এটি বেশ হজমকারক। এ ছাড়া লেবুতে যথেষ্ট পরিমাণে ভিটামিন-সি থাকে। বাংলাদেশে প্রায় ৪ হাজার হেক্টর জমিতে লেবুর চাষ হয় এবং মোট উৎপাদন প্রায় ১২ হাজার টন। হেক্টরপ্রতি ফলন ২.৫ থেকে ৩ টন। দেশের সর্বত্র চাষ হলেও এ ফলটি সিলেট, পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, শ্রীমঙ্গল ও মৌলভীবাজারে বেশি জন্মে।

শ্রীমঙ্গলে উন্নতমানের কাগজি, এলাচি ও বীজবিহীন লেবু উৎপন্ন হয় এবং প্রতি বছর প্রায় ৬০ কোটি টাকার লেবু শ্রীমঙ্গল থেকে যুক্তরাজ্যে রফতানি হয়। শ্রীমঙ্গল ছাড়াও নরসিংদী জেলার রায়পুরা এবং দক্ষিণ চট্টগ্রাম থেকে উন্নতমানের লেবু দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানি করা হয়।

লেবুর জাত : বাংলাদেশে অনেক জাতের লেবু পাওয়া যায়। তার মধ্যে বারি লেবু-১, বারি লেবু-২ ও বারি লেবু-৩ উল্লেখযোগ্য।

বারি লেবু-১ : জাতটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সংগৃহীত ৩০টি জাতের মধ্য থেকে বাছাই করা হয়েছে। এ জাতের লেবুতে এলাচ মশলার মতো গন্ধ থাকে বিধায় একে এলাচি লেবু নামেও ডাকা হয়। সারাদেশে চাষবাদের জন্য এ জাতটিকে ১৯৯৬ সালে অনুমোদন দেয়া হয়। এ জাতের গাছে সময় মতো সার ও সেচ দিলে বছরে দু’বার ফল দেয়। একটি গাছে ১০০ থেকে ১৫০টি ফল ধরে। প্রতিটি ফলের ওজন ২৫০ থেকে ২৭০ গ্রাম। লেবুর এ জাতটি দেশের সর্বত্র চাষযোগ্য। তবে পাহাড়ি বৃষ্টিবহুল এলাকায় বেশি ফলন হয়।

বারি লেবু-২ : বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে জার্মপ্লাজম সংগ্রহ করে জাত মূল্যায়নের মাধ্যমে বারি লেবু-২ জাতটি উদ্ভাবন করা হয়। ১৯৯৭ সালে জাতটি সারা দেশে চাষের জন্য অবমুক্ত করা হয়। এ জাতটিতে নিয়মিত ফল ধরে। ফল গোলাকার। প্রতিটি ফলের ওজন ৭৫ থেকে ৮৫ গ্রাম। ফলটি মাঝারি টক ও রসের পরিমাণ খুব বেশি। প্রতিটি গাছে ১৮০ থেকে ১৯০টি ফল ধরে।

বারি লেবু-৩ : বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সংগৃহীত লেবুর জার্মপ্লাজম মূল্যায়নের মাধ্যমে বাছাইকৃত জাত বারি লেবু-৩ নামে ১৯৯৭ সালে অনুমোদন করা হয়। এ জাতের লেবু গাছের পাতা ছোট আকৃতির ও সবুজ। নিয়মিত ফল ধরে। ফল গোলাকর। ফলের গড় ওজন ৫০-৬০ গ্রাম। হালকা টক, রসের পরিমাণ খুব বেশি। সাত/আট বছর বয়স্ক গাছে ২০০ থেকে ২২০টি ফল ধরে। বারি লেবু-৩ জাতটি বাংলাদেশের সর্বত্র চাষের জন্য উপযোগী।

মাটি : লেবু হালকা দোআঁশ ও পানি নিষ্কাশনের সুবিধাযুক্ত অম্লীয় মাটিতে ভালো জন্মে।

চারা উৎপাদন : বীজ, গুটি কলম ও শাখা কলম থেকে লেবুর চারা উৎপাদন করা হয়।

চারা রোপণ : মধ্য বৈশাখ থেকে মধ্য আশ্বিন হলো বাংলাদেশে লেবুর চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। ২.৫ থেকে ৩.০ মিটার দূরে দূরে লেবু গাছ রোপণ করা উচিত। লেবুর চারা রোপণের জন্য গর্তের উপযুক্ত আকার হলো ৪৫Í৪৫Í৪৫ সেন্টিমিটার।

সারের পরিমাণ : চারা রোপণের সময় প্রতিটি গর্তে গোবর ১০ কেজি, ইউরিয়া ৫০০ গ্রাম, টিএসপি ৪০০ গ্রাম ও এমওপি ৪০০ গ্রাম সার প্রয়োগ করতে হবে। লেবুতে সঠিক মাত্রায় সার ব্যবহার না করলে গাছের পাতা হলুদ হয়ে ঝরে যায়। নতুন পাতা ও কুশি কম হয়। গাছের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়। ফল ছোট হয় ও অধিকাংশ ফল ঝরে যায় এবং ফলন হ্রাস পায়। তাই ভালো ফলনের প্রতিটি গাছে নিয়মিত সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করতে হবে।

একটি পূর্ণবয়স্ক গাছে বর্ষার আগে ও পরে দুইবারে উল্লিখিত পরিমাণ সার প্রয়োগ করতে হবে। পচা গোবর ৩০ কেজি, খৈল ২ কেজি, ইউরিয়া ১ কেজি, টিএসপি ১.৫ কেজি, এমওপি ১ কেজি, কপার বা তুঁতে ১০ গ্রাম, বোরন ৫০ গ্রাম, জিংক ২০ গ্রাম, ম্যাঙ্গানিজ ১০ গ্রাম ও চুন ৩০ গ্রাম।

অঙ্গজ ছাঁটাই : প্রতি বছর মধ্য ভাদ্র থেকে মধ্য কার্তিক মাসে গাছের অবাঞ্ছিত শাখা ছাঁটাই করতে হবে।

লেবু ঝরা রোধ : বিভিন্ন গৌণ উপাদানের অভাবেও লেবু ফল ঝরে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে তুঁতে ৭ গ্রাম, জিংক ১০ গ্রাম, বোরন ১০ গ্রাম এবং চুন ২০ গ্রাম ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে গাছে স্প্রে করলে লেবুর ফল ঝরা দ্রুত বন্ধ হয়। এ ছাড়া প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম প্লানোফিক্স জাতীয় হরমোন মিশিয়ে গাছে ফুল আসার আগে এবং ফল ধরার পর গুটি হলেই গাছে স্প্রে করলে ফল ঝরা বন্ধ হয়। লেবু গাছের গোড়ায় পানি জমলেও ফল ঝরে যেতে পারে। সে জন্য লেবু গাছের গোড়ায় বেশিক্ষণ যাতে পানি জমে না থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

পোকামাকড় ও রোগবালাই : লেবু গাছে যেসব পোকা-মাকড় আক্রমণ করে তার মধ্যে লেবুর প্রজাপতি, সাদা মাছি ও মিলিবাগ প্রধান এবং রোগ-বালাইয়ের মধ্যে রয়েছে ক্যাংকার ও গামোসিস। এসব পোকামাকড় ও রোগবালাই সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থার মাধ্যমে দমন করতে হবে।

পানি সেচ ও নিষ্কাশন : খরা মৌসুমে ২-৩ বার সেচ প্রয়োগ করা দরকার। লেবু গাছ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না বিধায় বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাতের সময় গাছের গোড়ায় যাতে পানি না জমে সে জন্য নালা করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।

ফল সংগ্রহ : সচরাচর ফেব্রুয়ারি মাসে গাছে ফুল ধরে এবং জুন-আগস্ট মাসে লেবু খাওয়ার উপযোগী হয়। রোপণের ২-৪ বছর বয়স থেকে গাছে ফল ধরতে শুরু করে। প্রতিটি গাছে ১০০ থেকে ২৫০টি ফল পাওয়া যায়। উপযুক্ত যতœ নিলে একর প্রতি ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার লেবু পাওয়া সম্ভব।

Add a Comment

Your email address will not be published.

CAPTCHA