কৃষি বিপ্লবঃ একই জমিতে ধান চাষের চেয়ে হাঁস মুরগির খামার করা অনেক বেশি লাভজনক

ধান থেকে মুরগি ও অন্যান্য অনেককিছুতেই দেশের কৃষি খাতে বিপ্লব এনেছে বিজ্ঞান। গত কয়েক দশকে দেশের কৃষি খাতে এসেছে অভাবনীয় পরিবর্তন। এই কৃষি বিপ্লবের পেছনে রয়েছে গবেষণা।

১৯৭১ সালের আগে নওগাঁর কৃষক মোকাব্বর আলী প্রতি বিঘা জমি থেকে পেতেন ৪-৬ মণ (প্রতি মণে প্রায় ৩৭ কেজি) ধান। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে বিভিন্ন জাতের হাইব্রিড ধান পৌঁছে যাওয়ায় বিঘাপ্রতি ধানের ফলন ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।

২০১৫ সালে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) থেকে বীজ নেন মোকাব্বর। সেই বীজ ব্যবহার করে তিনি প্রতি বিঘা জমিতে প্রায় ২৮ মণ ধানের ফলন পান।

৭০ বছর বয়সি এই কৃষক বলেন, ‘সরকারি বীজ একেবারেই অন্যরকম।’ গত অর্ধশতকে চাষবাসের চেহারা পাল্টে দেওয়া কৃষি-জাদুর ব্যাপারে এই বর্ষীয়ান কৃষক কিছুই জানেন না।

এই কৃষি-জাদুর মধ্যে রয়েছে উচ্চ ফলনশীল ফসলের জাত এবং দক্ষ চাষাবাদের যন্ত্রপাতি আবিষ্কার। এর ফলে মোকাব্বরের মতো কৃষকরা ৫০ বছর আগে যে পরিমাণ ধান ফলাতেন, এখন ফলাতে পারেন তারচেয়ে চারগুণ বেশি ধান।

১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পূর্বাভাস দিয়েছিল বাংলাদেশ হচ্ছে একটি ‘গন কেস’—অর্থাৎ বাংলাদেশ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। এ পূর্বাভাসের সমুচিত জবাব হয়ে এসেছে এই চারগুণ ধান উৎপাদন।

স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তখন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট (ব্রি) বিআর-৩ নামের একটি ধানের জাত উদ্ভাবন করে। জাতটি খুব অল্প সময়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং আউশ, আমন ও বোরো তিনটি মৌসুমেই একই জাতের ধান চাষ হয়। যে কারণে এটি বিআর-বিপ্লব হিসেবে পরিচিত পায়।

গবেষকরা বলছেন, শুরুতে বিআর-৩-এর মাধ্যমে ১৯৭৩-পরবর্তী সময়ে ধানের উৎপাদন ১ কোটি টন থেকে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ টনে উন্নীত হয়। এরপর ১৯৮০ সালে ব্রি-১১ নামের আরেকটি জাত উদ্ভাবন করে ব্রি। আশির দশকে এই জাতটি ধীরে ধীরে বিআর-৩-এর জায়গা নেয়। এরপর নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝিতে আসে বিআর-২৮ ও ২৯, যা বোরো মৌসুমে মেগা জাত হিসেবে পরিচিতি পায়। এ দুটি জাত সারাদেশে ধান উৎপাদনে আরও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে।

ব্রি-র মহাপরিচালক ড. মো. শাহজাহান কবীর জানান, দেশে এখন উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত ২০০-র বেশি। সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরে ধান উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ৮০ লাখ টন।

শুরুতে কৃষি গবেষণা কেবল ধান উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বিজ্ঞান ও গবেষণা ধীরে ধীরে মৎস্য, পোল্ট্রি, দুগ্ধ ও গবাদিপশুর মধ্যে ঢুকে পড়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ফসল, মাছ ও গবাদিপশুর মোট ১ হাজার ১৬০টি নতুন জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে।

ধানের উৎপাদনে বিআর-৩, বিআর-১১, মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে তেলাপিয়া ও পাঙ্গাস, মাংস ও ডিমের জোগান বৃদ্ধিতে পোল্ট্রি ও সোনালি মুরগি গেইম চেঞ্জারের ভুমিকা রেখেছে। এই সবগুলো জাতই বাংলাদেশের নিজস্ব গবেষণার ফসল।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) কর্তৃক প্রকাশিত ‘১০০ ইয়ারস অভ এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ বই থেকে জানা যায়, বর্তমানে গবাদিপশু, মৎস্য ও ফসল খাতে জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে ১৩টি।

১৯৭০ সালে ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের জন্ম হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। স্বাধীনতার পর এটিকে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট হিসেবে নামকরণ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি ধানের উৎপাদন ও জাত উন্নয়নে কাজ করছে। ব্রি উদ্ভাবিত ধানের জাতগুলো এখন নানা বৈশিষ্ট্যের। কোনোটা রোগ প্রতিরোধী, কোনোটা আবার লবণাক্ততা সহনশীল। এছাড়া বন্যা, খরা, ঠান্ডা, অঞ্চলভিত্তিক বৈশিষ্ট্য, জিঙ্ক সমৃদ্ধ, উচ্চ ফলনশীল নানা ধরনের জাত উদ্ভাবন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

ধানের জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি ফসলের প্রযুক্তি উদ্ভাবন নিয়েও কাজ গবেষণা করছে বাংলাদেশ পরমাণু গবেষণা কেন্দ্র (বিনা)। ধান ছাড়াও মরিচ, ডাল, গম, রসুন, পেঁয়াজ, টমেটোসহ বিভিন্ন ফসলের রোগ প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবন, জীবনকাল কমিয়ে আনা, ফসল সংগ্রহ-পরবর্তী লোকসান কমিয়ে আনা, উৎপাদিত পণ্যের শেলফ-লাইফ বৃদ্ধিসহ নানা কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।

বিনার মহাপরিচালক ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম বলেন, ‘জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি আমরা কৃষি প্রযুক্তির উন্নয়নে প্রতিনিয়তই গবেষণা করছি। যার প্রভাবে কৃষি উৎপাদন প্রতিনিয়তই বৃদ্ধি পাচ্ছে।’

এদিকে সবজিসহ আলু ও ডালজাতীয় বেশকিছু পণ্যের জাত উদ্ভাবনে কাজ করছে বারি। প্রতিষ্ঠানটি গম, ভুট্টা, বেগুন, আলু সহ বেশকিছু ফসলের জাত উদ্ভাবন করছে। উচ্চফলনশীলতার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মাথায় রেখে প্রতিষ্ঠানটি জাত উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিচ্ছে।

আলুর জাত উদ্ভাবনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় বারি। বারি-উদ্ভাবিত উন্নত জাতের কারণেই এখন আলুর উৎপাদন এক কোটি টনের কাছাকাছি। গমের নানা জাত উদ্ভাবন হলেও পরিবেশগত কারণেই এর উৎপাদন খুব বেশি বাড়ানো সম্ভব হয়নি। তবে ভুট্টা উৎপাদনে বাংলাদেশে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে। উৎপাদনের শুরুটা গমের পরে হলেও ভুট্টার উৎপাদন এখন ৬০ লাখ টনের আশেপাশে।

বারির মহাপরিচালক ড. দেবাশীস সরকার বলেন, ‘গবেষণার কারণেই কৃষি খাতের চিত্র পাল্টে গেছে। কারণ গবেষণার মাধ্যমে উন্নত জাত ও প্রযুক্তিগুলো স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদনে ব্যবহার করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, তাদের বর্তমানের গবেষণাগুলো করতে হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মাথায় নিয়ে।

সবজির জাত উদ্ভাবন ও গবেষণায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি সাফল্য দেখিয়েছে বেশকিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। লাল তীর, এসিআই, সুপ্রিম সীড, ব্র্যাকসহ অনেক প্রতিষ্ঠানের দখলে এখন সবজির বীজের ব্যবসা। এ পর্যায়টি তৈরি হয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব গবেষণার কারণে। প্রতিষ্ঠানগুলো সবজির পাশাপাশি ধানের হাইব্রীড বীজের জাতও উদ্ভাবন করছে।

মৎস্য বিপ্লবের নেতৃত্বে তেলাপিয়া ও পাঙ্গাস

স্বাধীনতার পর সময়ে থাইল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে নাইলোটিকা নামের তেলাপিয়ার একটি জাত নিয়ে আসেন গবেষকরা। পরীক্ষামূলক চাষাবাদ ও গবেষণার মাধ্যমে এর বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় আশির দশকে। দ্রুত বর্ধনশীল ও লাভজনক হওয়ায় সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এ মাছের চাষ দ্রুত।

বর্তমানে দেশে প্রতি বছর প্রায় ৪ লাখ টন তেলাপিয়া মাছ উৎপাদন হয়। গবেষকদের তথ্যানুসারে, তেলাপিয়ার যে জাতটি এখন চাষ হচ্ছে সেটি ১৩তম প্রজন্ম, যা গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবন করা হয়েছে। এই প্রজন্মের তেলাপিয়া যারা চাষ করছেন তারা প্রথম জাতের তুলনায় ৬৩ শতাংশ বেশি উৎপাদন পাচ্ছেন।

বাজারে এক-দেড় কেজি ওজনের যেসব তেলাপিয়া কিনতে পাওয়া সেটাও বিজ্ঞানীদের গবেষণার ফল।

জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার তথ্য বলছে, বিশ্বের মধ্যে তেলাপিয়া উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে।

থাইল্যান্ড থেকে আরও একটি মাছ নিয়ে আসা হয় নব্বইয়ের দশকের শুরুতে, যেটি পাঙ্গাস নামে পরিচিত। স্থানীয় আবহাওয়া-উপযোগী করে পাঙ্গাসের জাত উন্নয়ন ও উদ্ভাবন করে স্থানীয়ভাবে চাষাবাদ শুরু হয়। নব্বইয়ের শুরু শেষ দিকে পাঙ্গাসেরও ব্যাপক বাণিজ্যিক চাষাবাদ শুরু হয়। এখন বাজারে সাধারণ মানুষের মাছ হিসেবে তেলাপিয়া ও পাঙ্গাস দুটি বেশ জনপ্রিয়।

এছাড়াও গবেষকরা গবেষণাগারে অনেকগুলো ছোট মাছের জাত উদ্ভাবন করেছেন বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য। ২০০৮-০৯ সালে ছোট মাছের উৎপাদন ছিল ৬৭ হাজার টন, যা এখন আড়াই লাখ টনে পৌঁছেছে। উন্নত জাত উদ্ভাবিত হওয়ায় পাবদা, কৈ, শিং, টেংরাসহ বিভিন্ন মাছের উৎপাদন বেড়েছে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউট (বিএফআরআই)-এর মহাপরিচালক ও বিজ্ঞানী ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ টিবিএসকে বলেন, ‘মাছের অ্যাভেইলেবিলিটি নিশ্চিতের পেছনে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ ভূমিকা রেখেছে। তেলাপিয়া, পাঙ্গাস ও কৈ মূলত দেশের মাছ চাষকে একটি ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। এটা পুরোটাই আমাদের গবেষণার ফল। ধারাবাহিক গবেষণার ফলেই মাছ চাষে এত বেশি সফলতা এসেছে। বর্তমানে সবমিলে প্রতি বছর মাছ উৎপাদন ৪৫ লাখ টন ছাড়িয়েছে, যা চাহিদার চেয়ে বেশি।’

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ এখন বদ্ধ জলাশয়ের মাছ আহরণ ও উৎপাদনের দিক থেকে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে।

বিএফআরআই ও মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নব্বইয়ের দশকে পোনা উৎপাদনের জন্য হ্যাচারির সংখ্যা ছিল ৬০-৬৭ টি। বর্তমানে এই সংখ্যাটা এসে ঠেকেছে ৯৫০টিতে, যার মধ্যে ৮২০টিই বেসরকারি মালিকানাধীন। এর পেছনে গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত গবেষকরা বিভিন্ন মাছের ৬০টি জাত, প্রজনন ও চাষাবাদের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। এসব উদ্ভাবন মৎস্য খামার ও হ্যাচারিতে ব্যবহার করা হচ্ছে।

গবেষণার জন্য বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউট গঠন করা হয় ১৯৮৪ সালে। একসময় মুক্ত জলাশয়ের উপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ এখন বদ্ধ জলাশয়ের চাষের মাছের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। চাষের মাধ্যমে হারিয়ে যেতে বসা বিভিন্ন প্রকারের ছোট মাছ, কই, শিং, রুই কাতলাসহ বিভিন্ন মাছের জাত উদ্ভাবন করে এই প্রযুক্তিগুলো খামারিদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে।

ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ বলেন, ‘মৎস্য খাতে গবেষণায় জোর দেয়ার জন্য গত ৫-৭ বছরে ১০০-র বেশি বিজ্ঞানীর নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়েছে এবং নিয়োগ দেয়া হয়েছে।’

মাংসের চাহিদা মেটাতে ব্রয়লারের আগমন

নিজেদের ক্যাটারিং সার্ভিসের জন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আশির দশকে দেশে সর্বপ্রথম ব্রয়লার মুরগির বাচ্চা এনে পালন শুরু করে। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় এই মুরগি টিকে যাওয়ার পর থেকেই দু-একজন করে বিমানের কাছ থেকে বাচ্চা সংগ্রহ করে এর পালন শুরু করে।

তবে সর্বপ্রথম এগস অ্যান্ড হেনস লি. নামের একটি প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে পোল্ট্রি উৎপাদন শুরু করে। মাত্র ৪-৬ সপ্তাহে খাওয়ার উপযোগী হওয়ায় এবং উৎপাদন খরচ কম থাকায় ধীরে ধীরে এটি ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

লাভজনক হওয়ায় ১৯৮৩ সালে ব্র্যাক তাদের রুরাল পোল্ট্রি মডেল প্রকল্পে দরিদ্র কৃষকদের উঠান পর্যায়ে পোল্ট্রি খামার তৈরিতে উৎসাহিত করে। আশির দশকের শেষ ও নম্বইয়ের দশকে পোল্ট্রি উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধি পায়। কর্মসংস্থানের একটি খাত হয়ে উঠে পোল্ট্রি খামার। এ কারণে সরকারও বিভিন্ন নীতিগত সহায়তা এবং বিনিয়োগের পথ তৈরি করে দেয়।

ব্রয়লার ছাড়াও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের গবেষণার মাধ্যমে দেশে উদ্ভাবিত আরেকটি মুরগির জাত জনপ্রিয় হয়েছে, যা এখন সোনালি নামে পরিচিত। স্বাদ ও দেখতে অনেকটা দেশি মুরগির মতো হওয়ায় সোনালির চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে।

বর্তমানে বাজারের ৬০ ও ৪০ শতাংশ যথাক্রমে ব্রয়লার ও সোনালির দখলে রয়েছে। আর ডিমের চাহিদার ৮০ শতাংশ জোগান আসছে পোল্ট্রি খাত থেকে। এই খাতে এখন বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা।

প্রণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত এক দশকে দেশে মাংসের উৎপাদন তিনগুণেরও বেশি এবং ডিমের উৎপাদন প্রায় তিনগুণ বেড়েছে।

কৃত্রিম প্রজননে দুধ, মাংস উৎপাদনে সাফল্য

২০২০-২১ অর্থবছরে মাংস উৎপাদন হয়েছে ৮৪ দশমিক ৮০ লাখ টন, দুধ উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ১৯ লাখ টন। গবেষকরা বলছেন, পরিবেশগত কিছু কারণে দুধে একটু পিছিয়ে থাকলেও মাংস ও ডিমে বাংলাদেশ বেশ এগিয়েছে। পোল্ট্রির বাইরে গরু ও ছগলের কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে গবাদিপশু খাতের ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে।

কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন উন্নত মানের ষাঁড় উৎপাদন করছে। এ প্রযুক্তির সুবাদে প্রত্যন্ত জেলাগুলোতেও এখন হাজার হাজার গরুর খামার তৈরি হয়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বলছে, মাঝে মাংসের উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বড় হওয়া ব্রাহমা জাতের উৎপাদনে গেলেও দুধ কমে যাওয়ার শঙ্কায় সরকার আপাতত এই জাতের কৃত্রিম প্রজনন বন্ধ রেখেছে। যদিও বিশ্বের অনেক দেশই মাংসের জন্য দ্রুত বড় হওয়া জাতের দিকে ঝুঁকছে। তবে দুধের জন্য উন্নত জাতের গাভি পালনেও গুরুত্ব দিচ্ছেন খামারিরা।

প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইন্সটিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ড. নাথুরাম সরকার টিবিএসকে বলেন, কৃত্রিম প্রজনন শুরু হওয়ার পর থেকে এই খাতের আকার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে উদ্ভাবিত জাতগুলো বড় বিনিয়োগ নিয়ে আসছে। অনেক তরুণ উদ্যোক্তাই এখন গবাদিপশু পালনে আসছেন।

ড. নাথুরাম সরকার বলেন, প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইন্সটিটিউট রোগ নির্ণয়, প্রযুক্তি, উৎপাদন পদ্ধতিসহ নানা বিষয় নিয়ে গবেষণা করে প্রতিনিয়ত এ খাতকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।

কৃষির চেহারা বদলে দিয়েছে যেসব কৃষি প্রযুক্তি

ফেরোমন ফাঁদ হলো এক ধরনের কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে রাসায়নিক কীটনাশক বা কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না। তার বদলে এ পদ্ধতিতে জৈবিকভাবে উৎপাদিত রাসায়নিক ফেরোমন ব্যবহার করা হয়। এই রাসায়নিক পোকামাকড়কে আকৃষ্ট করে জৈব পদ্ধতিতে ফসল বাঁচাতে সাহায্য করে। অনেক কৃষকই এখন প্রাকৃতিক উপায়ে কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণের উপর বেশি জোর দিয়ে ফসল উৎপাদনে ফেরোমন ব্যবহার করছেন।

একসময় কৃষকরা প্যাডেল-সেচ দিয়ে জমিতে পানি দিতেন। এখন তার জায়গা নিয়েছে ডিজেলচালিত মোটর এবং গভীর বৈদ্যুতিক নলকূপ।

স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত কৃষি খাতে সর্বমোট ১ হাজার ১৬৭টি নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন বিজ্ঞানী ও গবেষকরা।

আগে কৃষি খাত ব্যাপকভাবে কায়িক শ্রমের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ষাঁড় ও লাঙলের ব্যবহার থেকে কৃষকরা এখন জমি চাষ করার জন্য ট্রাক্টর ব্যবহার করছেন। শারীরিক শ্রমনির্ভর হওয়ায় আগে বীজ বপন থেকে শুরু করে ফসল সংগ্রহ পর্যন্ত অনেক সময় লেগে যেত, সে প্রক্রিয়াও ছিল অত্যন্ত ধীর। এখন কৃষিযন্ত্রের সুবাদে এ খাত হয়েছে গতিশীল।

বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা কৃষি যন্ত্র উদ্ভাবন করছে। অন্যদিকে ৩ হাজার ২০ কোটি টাকার খামার যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার।

ছোট আকারের চাষ এখন বাণিজ্যিক কৃষিতে পরিবর্তিত হয়েছে। অনেক কৃষি উদ্যোক্তাই হাই-ভ্যালু ফসলের দিকে ঝুঁকছে।

আরও গবেষক প্রয়োজন

উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত ব্রি-২৮ ও ২৯ জাত উদ্ভাবনে প্রাক্তন মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. প্রণব কুমার সাহা রায়, উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের ড. খাজা গুলজার হোসেন, ড. তানভির আহমেদ, ড. কামরুন নাহার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এই জাত দুটির মাঠ পর্যায়ের সম্প্রসারণে ব্রি-র সাবেক গবেষণা পরিচালক ড. মো. আবদুস সালাম ভূমিকা রাখেন।

এছাড়া ব্রি-র সাবেক গবেষণা পরিচালক তমাল লতা আদিত্য ১৫টি ধানের জাত উদ্ভাবনে কাজ করেছেন। এজন্য তিনি ‘ধান কন্যা’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী ড. খান শহীদুল হক দুগ্ধ উন্নয়ন ও গবাদিপশু মোটাতাজাকরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। পোল্ট্রি খাতের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন ড. ইমদাদুল হক। আর ইলিশ উৎপাদনে অবদান রেখেছেন ডা. আনিসুর রহমান।

এছাড়াও আরও কয়েকজন বিশিষ্ট গবেষকদের মধ্যে রয়েছেন বিনার ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম ও ড. শামসুন নাহার বেগম, কৃষিবিদ ড. মোহাম্মদ হোসেন মন্ডল এবং বারির কাজী এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, যিনি বিখ্যাত কাজী পেয়ারার জাত উদ্ভাবন করেছিলেন।

বিএআরসির তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে বর্তমানে কৃষি গবেষকের সংখ্যা ২ হাজার ৫০০, যা নেপাল ও শ্রীলঙ্কার চেয়ে বেশি কিন্তু ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় অনেক কম।

ব্রির মহাপরিচালক মো. শাহজাহান কবীর বলেন, ‘কৃষি গবেষণার জন্য অর্থায়ন কোনো সমস্যা নয়, আমাদের শুধু আরও গবেষক দরকার।’

কৃষি গবেষণা বাড়াতে পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধীনে একটি জিনোম সিকোয়েন্সিং কেন্দ্র গঠন করা হয়েছে। সম্প্রতি তারা পাটের জিনোম ডিকোড করার পরে আলোচনায় আসে। এই কেন্দ্রটিকে এখন একটি আলাদা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করার কাজ চলছে, যারা বিভিন্ন ফসলের জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ে কাজ করবে। যা পরবর্তীতে নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।