শৈশব থেকেই সন্তানকে সঞ্চয় শেখাবার সঠিক উপায়

শিশুর ভবিষ্যৎ তৈরি করতে শৈশবে অন্যান্য শিক্ষার সঙ্গে অর্থ savings সম্পর্কেও তাকে ধীরে ধীরে সচেতন হতে শেখান।লিখছেন সুষমা চট্টোপাধ্যায়।

শৈশবই প্রকৃত সময় শিক্ষার বীজ savings বপণ করার, কারণ শিশুমন তখন উদগ্রীব থাকে নতুন শিক্ষা গ্রহণ করার জন্যে। সুতরাং তখন থেকেই তাকে আর্থিক বিষয়ে ধীরে ধীরে সচেতন করে তুলতে বাধা কোথায়? তাই বলে, টাকা-পয়সা অথবা জমা-পুঁজি নিয়ে গুরুগম্ভীর পাঠ পড়ানোর প্রয়োজন নেই এই বয়সে।

যদি সঠিক পথে আপনি শিক্ষা দিতে পারেন তাহলে দেখবেন খেলাচ্ছলেই আপনার সন্তান যা-কিছু গ্রহণযোগ্য সব আয়ত্ত করে নিচ্ছে। জেনে নিন কয়েকটি উপায় যা আপনি আপনার সন্তানের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে দেখতে পারেন।

১) সন্তানের সঙ্গে রোজকার কথাবার্তায় রোজগার, খরচ, টাকা জমাবার savings বিভিন্ন উপায় নিয়ে খুব হালকা এবং জানিয়ে রাখার মতো কিছু বেসিক আলোচনা করুন। সন্তান যত বড়ো হতে থাকবে শিক্ষার বিষয় এবং মান, সন্তানের বয়স অনুপাতে রাখার চেষ্টা করুন।

২) সন্তানের সঙ্গে গল্পের ছলে আলোচনা করুন, বাচ্চার মা-বাবা হয়ে আপনাদের সংসার চালাবার জন্য কী কী দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। খাবারদাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের জোগান দিতে গিয়ে অভিভাবক হিসেবে কত ধরনের কাজ করতে হচ্ছে। কীভাবে টাকার জোগাড় হচ্ছে এবং তার পেছনে কতটা পরিশ্রম রয়েছে ইত্যাদি। শৈশব থেকেই বাচ্চারা তাহলে শিখবে টাকার মূল্য কতটা।

৩) অর্থের মূল্য কী, এটা বাচ্চারা একবার বুঝতে শিখলেই জমাবার অভ্যাস তাদের মধ্যে তৈরি করে দিতে হবে। তাদের একটা পিগি ব্যাংক উপহার দিতে পারেন এবং তাদের বলুন রোজ কম করে ওতে দুটো করে কয়েন ফেলতে।

৪) বোঝার একটু বয়স হলেই সন্তানকে নিজের সঙ্গে ব্যাংক-এ নিয়ে যান এবং যেগুলো সহজ ব্যাংকিং পদ্ধতি সেগুলো বিশদে ওকে বুঝিয়ে বলুন। ব্যাংকিং টার্ম যেমন ‘সেভিংস অ্যাকাউন্ট’, ‘ফিক্সড্ ডিপোজিট’, ‘উইথড্রল’ এবং ‘ডিপোজিট’, এগুলির সঙ্গে বাচ্চাকে পরিচয় করান।

৫) বাড়িতে বিভিন্ন পেমেন্ট যন্ত্রের সঙ্গে তাকে পরিচয় করান। চোখে দেখা জিনিস সহজে ভোলার নয়। তাই চোখের সামনে জিনিসগুলির ব্যবহারের নিয়ম দেখলে ওর মস্তিষ্কে সহজে জিনিসটা গেঁথে যাবে। কী করে চেক বুক, এটিএম কার্ড, ক্রেডিট কার্ড ব্যাবহার করতে হয় সন্তানকে দেখান এবং এগুলির কাজ ওদের কাছে ব্যাখ্যা করে বলুন।

৬) সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ‘ফিল্ড ট্রিপ’ প্ল্যান করুন কাছের সুপারমার্কেটে। ধরুন মাসকাবারির বাজার করতে গেছেন। জিনিস কেনার সঙ্গে সঙ্গে দামটা আপনার সন্তানকে বলুন এবং মনে মনে যোগ করে একটা হিসেব রাখতে বলুন। দোকানে দাম দেবার সময় দোকানের বিলে টোটাল দাম এবং বাচ্চার মনে মনে অঙ্ক কষে বার করা দামটা মেলাতে বলুন।

ভুল কি ঠিক বাচ্চা নিজেই বুঝতে পারবে। এছাড়াও দাম দেবার সময় পুরো টাকাটা যখন দিচ্ছেন, তখন ব্যালান্স টাকা ফেরত পাওয়ার হলে বাচ্চাকে জিজ্ঞেস করুন কত টাকা আপনার ফেরা উচিত। এগুলি আপনার বাচ্চার অঙ্ক করার ক্ষমতা যেমন বাড়াবে তেমনি ভবিষ্যতে কেনাকাটার বিষয়ে তাকে স্মার্ট করে তুলবে।

৭) ‘রোল প্লে’, শিক্ষা দেবার একটা দারুণ রাস্তা। বাচ্চারা যখন বাড়িতে বসে ক্লান্ত তখন একটা মজার খেলা খেলুন। ওদের হাতে কিছু খুচরো টাকা দিয়ে রাখুন। তারপর কিছু জিনিস নিয়ে মিছিমিছি দোকান সাজিয়ে বসুন। প্রত্যেকটি জিনিসে দামের ট্যাগ লাগান। প্রত্যোকটির দাম যেন আলাদা আলাদা হয়। এবার মজার ছলে দোকানদার এবং ক্রেতার ভূমিকায় সন্তানকে নিয়ে খেলুন।

৮) এমন খেলনা বাচ্চাকে কিনে দিন যেটা খেললে টাকা-পয়সার হিসেবের অঙ্কটা তার মগজে গেঁথে যাবে। যেমন ‘মোনোপলি’ এমন একটা খেলা যার মাধ্যমে টাকা-পয়সার লেনদেন সংক্রান্ত একটা পরিষ্কার ধারণা জন্মায়। ট্র্যাডিশনাল বোর্ড গেমও বাচ্চাদের অর্থ-সংক্রান্ত জ্ঞানকে আরও নিখুঁত করতে সাহায্য করে।

৯) যখন বাচ্চার উপযুক্ত বয়স হবে ‘পকেট মানি’ পাবার তখন তাদের প্রয়োজনমতো টাকা দিন। কীভাবে টাকাটা তারা খরচ করবে তাই নিয়ে খুব বেশি তর্কবিতর্ক করবেন না। কিন্তু খেয়াল রাখবেন পকেট মানি থেকে খানিকটা টাকা যেন তারা আলাদা বাঁচিয়ে রাখে ‘সেভিংস’-এর জন্য। কী খাতে তারা খরচ করছে তারও একটা খেয়াল আপনাকে রাখতে হবে। তাদের এমন পদক্ষেপ নিতে অ্যাডভাইস দিন যাতে ভবিষ্যতে তাদের আর্থিক স্বাধীনতা নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি হয়।

১০) নানা ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বাচ্চারা নিজেদের অজান্তেই, মা-বাবা যা করেন তাই অন্ধের মতো অনুসরণ করে। যদি মা-বাবা টাকা পয়সা দিয়ে সাবধানি হন তাহলে চান্স থাকে তাদের ছেলেমেয়েরাও ওই সঞ্চয়ের savings পথই অবলম্বন করবে। সুতরাং শিক্ষা দিন সন্তানকে, ভবিষ্যতে উপযুক্ত হয়ে নিজেদের যেন তারা গড়ে তুলতে পারে।