চলতি মৌসুমে ৪০ কোটি টাকার কারেন্ট মরিচ বিদেশে রফতানির আশা

মানিকগঞ্জের শিবালয়ে কারেন্ট মরিচ চাষ করে স্বাবলম্বী ৪০ পরিবার। কারেন্ট মরিচ কম খরচে অধিক উৎপাদন, দেখতে সুন্দর, ঝাল, স্বাদ, মানের দিক থেকে ভালো, ৪-৫ দিনেও নষ্ট হয় না।

 

 

কারেন্টের মতো কাজ করে বলে এ মরিচের নাম দেয়া হয়েছে কারেন্ট মরিচ। এখানকার মরিচ এখন এলাকার চাহিদা পূরণ করে দুবাই, ইতালিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হচ্ছে।

 

 

স্থানীয় কৃষকদের প্রত্যাশা, চলতি মৌসুমে এ অঞ্চল থেকে ৪০ কোটি টাকার কারেন্ট মরিচ বিদেশে রফতানি করা হবে। এরইমধ্যে রাতের বাজারকে ‌‘কালেকশন সেন্টার’ ঘোষণা দিয়েছে কৃষিবিভাগ।

 

 

মানিকগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, এ বছর জেলায় ৩ হাজার ২৯১ হেক্টর জমিতে মরিচের আবাদ হয়েছে। এতে উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছে ৩২ হাজার ৭৪৮ মেট্রিক টন।

 

 

সরেজমিনে উপজেলার মহাদেবপুর ইউপির রঘুনাথপুর বাজারে গিয়ে দেখা যায়, আরৎদাররা চাষিদের কাছ থেকে মরিচ কিনে দেশের বাইরে রফতানি করতে রাতেই তা বাজারজাত করছেন।

 

 

প্রতি রাতে এ বাজার থেকে ১০ থেকে ১৫ মেট্রিক টন কারেন্ট জাতের কাচা মরিচ সরাসরি বিদেশে রফতানির জন্যে রাতেই ঢাকায় নেয়া হয়। এলাকায় রঘুনাথপুর বাজার এখন রাতের মরিচের বাজার হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে।

 

 

এলাকার মরিচ চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ বছর রঘুনাথপুর, কাঐবিল, টেপরি, বনগ্রাম, কোনাবাড়ী, শাকরাইল, দড়িকান্দি, তাড়াইল, মানিকনগর, জুনিকালসা, ভাকলা, জামশা, বিরাজপুর, ঠেংগামারাসহ রঘুনাথপুর বাজারের আশপাশের প্রায় এক হাজার বিঘা জমিতে এ মরিচ চাষ হয়েছে। মারিচ চাষের সঙ্গে জড়িত রয়েছে ৫ হাজার নারী-পুরুষ।

 

 

কৃষক মো. জয়নাল বলেন, অন্য হাটের আড়ৎদারদের অত্যাচারে আমরা অতিষ্ঠ। একজন সাধারণ কৃষক আমার কাছ থেকে জোর করে মাল বাকিতে নিয়েছেন কিন্তু গত ১০ বছর আগের টাকা এখনও পাইনি। আমরা মহাখুশি এবং আমাদের এ রাতের বাজার যেন অব্যাহত থাকে তার জন্যে সংশ্লিষ্ঠকে কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করছি।

 

 

বরংগাইল গ্রামের মরিচ চাষি মো. হাতেম আলী বলেন, এ বছর ৩ বিঘা জমিতে কারেন্ট মরিচ আবাদ করেছি। এতে খরচ হয়েছে দুই লাখ বিশ হাজার টাকা। সিজন শেষে আট লাখ টাকার মরিচ বিক্রি করতে পারবো বলে আশা করছি। এ মরিচ চাষে খুবই লাভজনক। সিজনে প্রতি বিঘায় ৪-৫ মেট্রিক টন মরিচ উৎপাদন হয়।

 

 

মরিচ চাষি মো. শাহাদত হোসেন বলেন, আমরা অন্য ফসল আবাদ করে খুব বেশি লাভ করতে পারিনি। এ বছর পেঁয়াজ আবাদ করে উল্টো ক্ষতির মুখে পড়েছি। তবে মরিচের আবাদ করায় আমাদের সব ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারবো।

 

 

কারেন্ট মরিচ সাধারণ বিন্দু মরিচের চেয়ে দেড় থেকে দুই গুণ বেশি দামে বিক্রি হয়ে থাকে। মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে এ মরিচ বাজারে আসতে শুরু করেছে। কারেন্ট মরিচটা বিদেশে রফতানি চালু রাখতে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।

 

 

বরংগাইল বাজারের পাইকারী ক্রেতা মো. জয়নাল বেপারী মো. সবজাল মাতুব্বর, মো. বিল্লাল হোসন বলেন, এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা আরো ভালো হলে বড় ট্রাকগাড়ি এখানে আসতে পারতো। এখান থেকেই মরিচ প্যাকেজিং করে বিক্রি করা যেতো। এতে কৃষকরা আরো বেশি লাভবান হতো।

 

 

স্থানীয় কৃষক সমিতির সভাপতি দেওয়ান আব্দুর রউফ বলেন, আমরা ৩৫ টাকা কেজি দামে বিক্রি শুরু করি। এখন ১১০ টাকা কেজি বিক্রি করছি। আমাদের এ মরিচ সম্ভবত বাণিজ্যিক ভিত্তিতে দেশের অন্য কোথাও উৎপাদন হয়নি।

 

 

আমাদের বংগাইল বাজার থেকে বিক্রিত সব মরিচই এখন দেশের বাইরে রফতানি হচ্ছে। বাজার থেকে মরিচ কিনে রাতেই তা ঢাকায় নিয়ে প্যাকেট করে বিদেশে পাঠানো হয়। এ বছর আমাদের এলাকায় প্রায় ৫ হাজার মেট্রিক টন কারেন্ট মরিচ উৎপাদন হবে। এতে রফতানি আয় হবে প্রায় ৪০ কোটি টাকা।

 

 

শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাহিদুর রহমান বলেন, কৃষি ও কৃষকদের কল্যাণে যেকোনো সহযোগিতা করতে আমরা সদা প্রস্তুত। কৃষির জন্যে এ এলাকা অনেক সম্ভাবনাময় এলাকা।

 

 

শিবালয় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রিয়াজুর রহমান বলেন, উৎপাদন বৃদ্ধি, বাজারজাতকরণ, বিষ মুক্ত পণ্য উৎপাদন করার জন্যে এ এলাকার কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।

 

 

মানিকগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আবু মোহাম্মদ এনায়েত উল্লাহ্ গত ২১শে এপ্রিল রঘুনাথপুর রাতের বাজার পরিদর্শন করেন। তিনি কৃষকদের সুবিধার জন্যে এ বাজারকে ‘কালেকশন সেন্টার’ (কৃষিপণ্য সংগ্রহ কেন্দ্র) ঘোষণা করেন।

 

 

তিনি কৃষকদের শতকারা ৭০ ভাগ সরকারি ভর্তুকিতে কৃষি সরঞ্জাম দেয়ার ঘোষণা দেন। এময় তিনি এ ধরনের উন্নত রফতানিযোগ্য কৃষিপণ্য উৎপাদনের জন্যে কৃষকদের ধন্যবাদ জানান।

 

 

উপ-পরিচালক বলেন, কৃষকদের আরো উন্নত প্রশিক্ষণ দিয়ে সার্বিক সহযোগীতা করা হবে। দেশের রফতানি আয় কিভাবে বাড়ানো যায় তার সব চেষ্টাই করবো। আগামীতে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে বিভিন্ন পণ্য সংগ্রহ করে রফতানি করার ব্যবস্থা করা হবে। মানিকগঞ্জ থেকে উৎপাদিত সরিষার তেল বিদেশে রফতানি হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

 

তথ্যসূত্র : ডেইলি-বাংলাদেশ

Add a Comment

Your email address will not be published.

CAPTCHA