গরুর বিষ্ঠা (গোবর) থেকে প্রতি মাসে আয় লাখ টাকা

গরুর বিষ্ঠা (গোবর) থেকে প্রতি মাসে লাখ টাকা আয় করেন কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার সফর মল্লিক। কেঁচো দিয়ে গরুর গোবর থেকে উৎকৃষ্ট মানের ভার্মি সার উৎপাদন করেন তিনি।

 

 

তার খামার থেকে প্রতি মাসে গড়ে সাড়ে ১২ হাজার কেজি ভার্মি কম্পোস্ট সার উৎপাদন হয়। সফর মল্লিকের খামারে নিয়মিত কাজ করে দু’জন শ্রমিক। এক সময় বেকার থাকা সফর মল্লিক খামারের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তার দেখাদেখি অনেকেই গড়ে তুলেছেন এ ভার্মি কম্পোস্টের খামার।

 

 

খামারি সফর মল্লিক বাংলানিউজকে জানান, ২০১৮ সালে ১৬টি শেড করে চার লাখ টাকার কেঁচো দিয়ে প্রথম শুরু করি এ ভার্মি কম্পোস্টের খামার। শুরুর দিকে এ সারের প্রচলন না থাকার কারণে বাজারে এর চাহিদা ছিল না। সাধারণ কৃষকদের বিনামূল্যে সার দিয়েও এটার প্রচলন করতে হয়েছে।

 

 

তখন কেঁচো দিয়ে এ সার তৈরি করার কারণে লোকজন পাগল বলত। বিভিন্ন জন বিভিন্ন রকমের কটূক্তি করত। তবে এখন আর তেমন কেউ বলে না। এক সময় সার দিতে গেলে লোকজন বকা দিত। এখন সার চাহিদা মতো দিতে না পারায় কথা শুনতে হয়।

 

 

কেঁচো সার সম্পর্কে সফর মল্লিক জানান, এটি একটি উৎকৃষ্ট মানের সার। যার মধ্যে ফসলের উপকারী ২২টি উপদান রয়েছে। মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে চাষাবাদের জন্য উপযোগী করার ক্ষেত্রে এ সার অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

 

 

রাসায়নিক সারের তুলনায় মাটিতে সহজেই মিশে যায়। শাক-সবজিসহ যে কোনো ফসলের জমিতেই এটি ব্যবহার করা যায়। যার ফলে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কম লাগে।

 

 

খামার সম্পর্কে তিনি বলেন, মাত্র চার লাখ টাকার কেঁচো আর ৩০ ফুটের ১৬টি শেড নিয়ে শুরু করি এ খামার। বর্তমানে প্রতিটি শেডে আমার চার লাখ করে কেঁচো রয়েছে। যা থেকে দ্রুত সময়ে আমি সার উৎপাদন করতে পারি।

 

 

খামারের কাঁচামাল হিসেবে শুধু গোবর ব্যবহার করি। কেঁচোগুলো গোবর খেয়ে মল ত্যাগ করে। সেই মলই মূলত ভার্মি কম্পোস্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দুই রঙের ভার্মি কম্পোস্ট বাজারে পাওয়া যায়। একটা বাদামী আর আরেকটা কালো। চাহিদা মতো আমরা দুই রঙের সারই উৎপাদন করি।

 

 

তিনি আরও বলেন, উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শে আমি চেষ্টা করি, সবচেয়ে ভালো মানের ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনের। সার যত ঝরঝরে ও গন্ধমুক্ত হবে, তত মান ভালো হবে। এ খামারে উৎপাদিত সারের চাহিদা অনেক বেশি। কারণ, আমরা সবচেয়ে ভালোমানের সার উৎপাদন করি।

 

 

যা হাতের মুঠোয় চাপ দিলেই ঝরঝরে হয়ে যায়। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে এ সার বিক্রির পাশাপাশি বিদেশেও এ সার রপ্তানি করা হয়েছে। এরই মধ্যে কানাডায় এ সার রপ্তানি করে বেশ সুনাম অর্জন করেছি।

 

 

এ সারের কাঁচামাল হিসেবে গোবর ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন খামার থেকে এবং কৃষকদের বাড়ি থেকে কাঁচা গোবর কিনে আনতে হয়। বর্তমানে মানুষ গরু পোষা কমিয়ে দেওয়ায় গোবরের স্বল্পতা রয়েছে। এ কারণে দাম বেশি দিয়ে কিনতে হয়। সারের কেজি প্রতি সীমিত লাভ হয়, যোগ করেন সফর।

 

 

সার প্রস্তুত সম্পর্কে তিনি বলেন, গরুর কাঁচা গোবর নিয়ে এসে একেকটি শেডে দিই। এরপর শেডগুলোতে কেঁচো দেওয়া হয়। ২০-২৫ দিনের মধ্যে কেঁচোগুলো পুরো শেডের গোবর খেয়ে ফেলে। গরমে যাতে কেঁচোর যাতে কোনো সমস্যা না হয়, সেজন্য বাতাস ও পানির ব্যবস্থা করি।

 

 

অনেক সময় দেখা যায়, সার প্রায় হয়ে গেছে, তখন কেঁচোরা ডিম পেড়েছে। তখন বাচ্চা বের হওয়ার জন্য সার সংগ্রহ করতে দেরি হয়। সার সংগ্রহের পরে সেটাকে চালনি দিয়ে চেলে আলাদা করি। পরে সেটার মান পরীক্ষার জন্য ঢাকার ল্যাবে পাঠাই। “অ্যাগ্রো অ্যালকামি” অ্যাগ্রো কোম্পানির মাধ্যমে এ সারটি আমরা বাজারজাত করছি।

 

 

কৃষক পর্যায়ে পর্যাপ্ত এ সারের প্রচলন না থাকা এবং সঠিক দাম নির্ধারিত না হওয়ায় উৎপাদন করেও অনেক খামারি এ সার বিক্রি করতে পারেন না। ফলে তাকে লোকসান গুণতে হয়। এজন্য সরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়া হলে একদিকে যেমন এ সার উৎপাদনে এগিয়ে আসবে মানুষ, অন্যদিকে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমবে বলেও মনে করেন তিনি।

 

 

তিনি বলেন, ১২-১৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয় সার। স্থানীয় কৃষকদের কাছে বা বাজারে ১২ টাকা কেজি বিক্রি হয়। আর বাইরে বিক্রি করলে প্রতি কেজিতে ১৫ টাকা পাওয়া যায়। মাসে দেড় লাখ থেকে এক লাখ ৮০ হাজার টাকার মতো সার বিক্রি হয়।

 

 

আর খরচ বলতে গোবর কিনতে হয় বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন দামে। খামার থেকে গোবর বস্তা প্রতি ৪০ টাকায় কিনি বর্তমানে। এছাড়া নিয়মিত দু’জন শ্রমিক কাজ করেন। গোবর কেনা, পরিবহন ও শ্রমিক খরচ বাবদ মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়।

 

 

প্রতি মাসে একবার সার উত্তোলন করে বাজারে বিক্রি করতে পারলে সব খরচ বাদ দিয়ে লাখ টাকার মতো থাকে। বর্তমানে আমার খামারে যে কেঁচো আছে, সেগুলোর মূল্য কয়েক কোটি টাকা।

 

 

মিরপুর উপজেলা সদরপুর ইউনিয়নের রতন আলী। তিনিও ভার্মি কম্পোস্ট সার উৎপাদন করে স্বাবলম্বী হয়েছেন।

 

 

রতন আলী বাংলানিউজকে জানান, ভার্মি কম্পোস্টটা যদি কৃষকদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলন করা যেত, তাহলে খামারিরা লাভবান হতেন। সেই সঙ্গে মাটির জৈব পদার্থ বাড়ত এবং ফসলের উৎপাদন বাড়ত।

 

 

কচুবাড়ীয়া এলাকার কৃষক হেলাল উদ্দিন বাংলানিউজকে জানান, সবজি চাষের ক্ষেত্রে ভার্মি কম্পোস্ট খুবই কার্যকর। ফলন ও সবজির মান বৃদ্ধি করে। আমি কয়েক বছর ধরে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে ভার্মি ও জৈব সার ব্যবহারের কারণে আমার সবজির স্বাদ ও উৎপাদন বেশি হয়। সেই সঙ্গে এ সবজি স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ হয়।

 

 

কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, কুষ্টিয়া জেলায় ২০২১-২২ অর্থবছরে কৃষক পর্যায়ে ৩৮৩৬ মেট্রিকটন, বাণিজ্যিকভাবে ২০ মেট্রিকটন, এনজিওর মাধ্যমে ২৫ মেট্রিকটন ভার্মি কম্পোস্ট সার উৎপাদিত হচ্ছে।

 

মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রমেশ চন্দ্র ঘোষ বাংলানিউজকে জানান, ভার্মি কম্পোস্ট সার ফসল উৎপাদনে খুবই উপযোগী একটি সার। এছাড়া বাণিজ্যিকভাবে এ সার উৎপাদন করে অনেকেই স্বাবলম্বী হয়েছে। আমরা কৃষক পর্যায়ে এ সারের ব্যবহার বাড়াতে কাজ করছি।

 

 

সেই সঙ্গে উৎকৃষ্টমানের ভার্মি কম্পোস্ট সার প্রস্তুতে খামারিদের পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছি। আশা করি, নিরাপদ উপায়ে ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহারে আগ্রহী হবেন কৃষকরা।

 

তথ্যসূত্রঃ বাংলা নিউজ ২৪

Add a Comment

Your email address will not be published.

CAPTCHA