চাষ করুন অপার সম্ভাবনাময় আগর বৃক্ষ, এক গাছেই মিলবে লক্ষাধিক টাকা

আগর এক প্রকার চির সবুজ দ্রূত বর্ধনশীল বৃক্ষ। সাধারণত: ১৫-৪০ মিটার লম্বা এবং ০.৬-২.৫ মিটার ব্যাসের হয়ে থাকে। এই গাছের ফুল সাদা রংয়ের। তিন বছরের কাছাকাছি সময়ে গাছে ফুল আসে। ফল এক ধরণের ক্যাপসুল। আগর গাছের উৎপত্তি স্থান হলো দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার রেইন ফরেস্ট।

 

 

থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, চীন, ভারত, ভূটান ও বাংলাদেশে এর চাষ হয়ে থাকে। আগর গাছের জাইলেম বা কাষ্টল ভিতরে প্রাকৃতিকভাবে পতংগের সহায়তায় ছত্রাকের সংক্রমণের ফলে সুগন্ধি রেজিনযুক্ত গাঢ় বর্ণের কাঠ উৎপন্ন হয় যাকে Agarwood বলে।

 

 

আগর উডকে বাংলায় আগর গাছ এবং আগর উড থেকে সংগ্রহকৃত তেলকে আগর আতর বলা হয়। আরবী ভাষায় আগর উডকে Oud, হিন্দি ভাষায় আগর এবং ইংরেজী ভাষায়।

 

 

Aloe wood বা Wagle wood বলা হয়। এই আগর উডই আগর গাছের মূল্যবান অংশ যা থেকে সুগন্ধি তৈরি করা হয়। Aqyukarua গণের অর্ন্তভূক্ত গাছ থেকেই ইহা পাওয়া যায়। আগর Thymaleacear পরিবারের অন্তর্ভূক্ত। Aquilaria গণের ১৫ টি প্রজাতীর গাছ থেকে আগর উড সংগ্রহ করা হয়।

 

 

বাংলাদেশে যে আগর জন্মাতে দেখা যায় তার বৈজ্ঞানিক নাম Aquilaria malaccensis । আগর উড গাছের ভিতরের অংশে জন্মায় এবং বাহির থেকে অনেক সময় এর উপস্থিতি ভালোভাবে বোঝা যায় না। এ কারণে বিশেষ করে নব্বই এর দশকে আগর গাছ থেকে মূল্যবান আগর উড আহরণের জন্য প্রাকৃতিক বন থেকে নির্বিচারে আগর গাছ কর্তন করা হয়।

 

 

ফলশ্রূতিতে এর বেশ কয়েকটি প্রজাতি এখন বিলুপ্তির মুখোমুখি। এ প্রেক্ষিতে আগর গাছ Convention for International trade in Endangered species (CITIES) কর্তৃক বিশ্বের বিলুপ্তপ্রায় বৃক্ষ প্রজাতীর তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। ফলশ্রূতিতে CITIES এর অনুমোদন ব্যাতিরেকে প্রাকৃতিক বন থেকে আগর গাছ কর্তণ ও বাণিজ্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

 

 

হাজার বছর ধরে আগরের রেজিনযুক্ত কাঠ ধ্যানের সময় সুগন্ধ ছড়ানোর জন্য জ্বালানো হতো। মধ্যপ্রাচ্য, চীন ও জাপানে আগর উড জাত সুগন্ধি সামগ্রী ব্যবহারের ইতিহাস ৩০০০ বছরের পুরোনো। ধর্মীয় কারণে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রীস্ট সম্প্রদায়ের আগরের সুগন্ধিকে মহা মূল্যবান বস্তু মনে করে।

 

 

আগরের সুগন্ধি প্রশান্তিদায়ক এবং শরীরের শক্তি বৃদ্ধিকারী বলে কেউ কেউ মনে করে থাকেন। মালয় ও চাইনিজদের আদি চিকিৎসা পদ্ধতিতে রোগ নিরাময়ের ঔষধ প্রস্তুতির গুরূত্বপূর্ন উপাদান হিসাবে আগর কাঠ ব্যবহার হয়ে আসছে। অ্যারোমাথেরাপিতেও এর ব্যবহার আছে।

 

 

আগর উড থেকে আহরিত তেল বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান সুগন্ধি। এই সুগন্ধির বিশেষ বৈশিষ্ট হলো এটি একটি এ্যলকোহলমুক্ত সুগন্ধি। ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক আয়োজনে এ সুগন্ধির আকাশ ছোঁয়া চাহিদা বিশ্বজুড়ে।

 

 

আগর উড থেকে তৈরি কাঠের টুকরা বা আগর তেল বা আগর আতর উভয়ই সুগন্ধি হিসাবে ব্যবহৃত হয়। আগর তেল ছাড়া কাঠ বা পাউডারজাত সামগ্রী থেকে ধূপের ন্যায় প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে আগরের সুবাস নেয়া হয়। আগর উডের নির্যাশ সুগন্ধি সাবান, স্যাম্পুসহ অন্যান্য প্রসাধণ সামগ্রী তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।

 

 

সাধারণত: কয়েক দশক ধরে জন্মানো বয়স্ক গাছে রেজিনযুক্ত যৌগিক পদার্থের সৃষ্টি হয় যা প্রক্রিয়াজাত করে আগর তেল বা সুগন্ধি তৈরি করা হয়। কিন্তু বর্তমানে অনুজীব বিজ্ঞানীগণ তরুণ আগর গাছে কৃত্রিমভাবে সংক্রমণ ঘটিয়ে সেখানে সুগন্ধ সৃষ্টিকারী যৌগিক পদার্থ উৎপাদনে সক্ষম হয়েছেন।

 

 

এর ফলে আগর চাষের ক্ষেত্রে মানুষের প্রচলিত ধ্যান ধারণার ক্রমশ: পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে প্রাকৃতিকভবে আগর উড পেতে যেখানে ৫০ বছর বা তদূর্ধ সময় অপেক্ষা করতে হয় সেখানে কৃত্রিমভাবে সংক্রমণ ঘটিয়ে মাত্র ১২-১৫ বছর বয়সের আগর গাছ থেকে মূল্যবান আগর উড সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে।

 

 

অনেকের আগ্রহ ও সম্পৃক্ততা বাড়ছে আগর চাষের মাধ্যমে সবচেয়ে মূল্যবান এই কৃষিজাত পণ্য তৈরিতে। বর্তমানে স্বল্প এলাকা জুড়ে আগর বাগান এমনকি বসতবাটিতেও আগরের বাগান লক্ষ্য করা যায়।

 

 

আগর গাছে সুগন্ধি পদার্থ সৃষ্টির কারণঃ আগর গাছের সুগন্ধি পদার্থের উৎস হলো আগর উড যা আগর গাছের জাইলেম বা কাষ্টল অংশের অভ্যন্তরে সৃষ্ট কেবল গাঢ় রংয়ের কাঠ বিশেষ। গাছের ভিতরে রেজিনযুক্ত যৌগিক পদার্থ সমৃদ্ধ আগর উড ধারণ করলে গাছটি মূল্যবান হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

 

প্রাকৃতিকভাবে চাষ করা হলে আগর উড তৈরি হওয়ার সাথে গাছের বয়সের সরাসরি সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ গাছ শারীরবৃত্ত্বীয়ভাবে পরিপক্ক হলেই রেজিন ধারণ করবে বা আগর উড সংগ্রহের জন্য গাছ কর্তন করা যাবে এমন নয়। আগর গাছে প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম উপায়ে সৃষ্ট ক্ষত এর মাধ্যমে ছত্রাকের সংক্রমণ ঘটে।

 

 

প্রাকৃতিকভাবে সংক্রমণের কারণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ধারণা মতে Zinzera conferta প্রজাতির stem borer এর লার্ভা আগর গাছে ত বা গর্ত তৈরি করে, যা অনেকটা সুরঙ্গের মত। ছত্রাক এই সুরঙ্গপথে গাছের ভিতর প্রবেশ করে সংক্রমণ ঘটায়।

 

 

কয়েক ধরণের ছত্রাক দ্বারা এই সংক্রমণ ঘটে থাকে। এদের মধ্যে Aspergillus spp. Botryodiplodia spp., Diplodia spp., Fusarium buldiferum Fusarium laterium Fusarium Oxysporum Fusarium solani Penicillium spp Pythium spp,. উল্লেখযোগ্য।

 

 

ছত্রাক দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (defensive mechanism) স্বরূপ গাছ উচ্চ মাত্রায় উদ্বায়ী জৈব যৌগ সমৃদ্ধ এক প্রকার রেজিন উৎপন্ন করে, যা সংক্রমণ স্থলে ছত্রাকের বৃদ্ধি বা বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। আগর গাছের কাষ্টল অংশের অভ্যন্তরভাগে যেখানে রেজিন উৎপন্ন হয় সেই অংশের কাঠ হালকা বাদামী থেকে কালো বর্ণ ধারণ করে। গাছের যে যে অংশে সংক্রমণ ঘটে সেখানেই কেবল গাঢ় রংয়ের কাঠ দৃষ্ট হয়।

 

 

আর উপযোগী অবস্থায় গাছ কর্তনের পর কেবলমাত্র সেই অংশগুলো সংগ্রহ করে পাতন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মূল্যবান সুগন্ধি আগর তেল সংগ্রহ করা হয় কিংবা আগর উড জাত অন্যান্য সামগ্রী তৈরি করা হয়।

 

 

রেজিনযুক্ত জৈব পদার্থের মধ্যে Sesquiterpenes নামক এক বিরল উপাদানই প্রকৃতপক্ষে আগর কাঠ বা আগর তেলের সুগন্ধ প্রদান করে থাকে। কৃত্রিমভাবে এই উপাদানটি সংশ্লেষণ করা এখন পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। এ কারণে সারা পৃথিবীতে উৎকৃষ্ট মানের আগর উডের কোন বিকল্প নেই।

 

 

আগরের বাণিজ্য ঃ প্রাকৃতিক বন থেকে সংগৃহীত আগর উডের মূল্য প্রতি কেজি কয়েক ডলার থেকে ১০,০০০ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৭.৭৫ লক্ষ টাকার বেশি। মানের উপর দামের হেরফের হয়ে থাকে। আবার আবাদকৃত গাছের প্রতি কেজি আগর উডের মূল্য ৫০০০ ডলার বা প্রায় ৩.৮৭ লক্ষ টাকা। মোটামুটি মানের আগর তেলের প্রতি কেজির মূল্য ৮০০০ ডলার বা প্রায় ৬.২০ লক্ষ টাকা।

 

 

তবে উচ্চ মানের আগর তেল ৫০,০০০ ডলার বা প্রায় ৩৮.৭৫ লক্ষ টাকার বেশি মূল্যে বিক্রি হয়। পৃথিবীর প্রায় ৮০ টি দেশ আগর জাত সামগ্রী আমদানী করে। প্রধান আমদানীকারক দেশ হলো-সংযুক্ত আরব আমিরাত, জাপান, সৌদি আরব ও তাইওয়ান।

 

 

প্রধান রপ্তানিকারক দেশ হলো- সিংগাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দেনেশিয়াও থাইল্যান্ড। প্রতিবছর সিংগাপুর থেকে ১.২ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৯,৩০০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের আগর জাত সামগ্রী রপ্তানি করা হয় (জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থা )।

 

 

আগর চাষে বাংলাদেশের অবস্থানঃ আগর উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের মানদন্ডে তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। ভারতের সীমানা সংলগ্ন মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার সুজানগর ইউনিয়নে ব্যাপকভাবে আগরের আবাদ লক্ষ্য করা যায়। ছোট বড় বাগানের পাশাপাশি বসতবাটির আঙ্গিনায় পর্যন্ত আগর চাষ করা হচ্ছে। এখানকার আগর চাষের ইতিহাস প্রায় ৪০০ বছরের পূরাতন।

 

 

কীভাবে এর সূচনা হয়েছে সুস্পষ্টভাবে জানা না গেলেও ধারণা করা হয় মৌলভীবাজার জেলার সীমান্তবর্তী ভারতীয় এলাকা থেকে আগর চাষের জ্ঞান ও প্রযুক্তি এদেশে এসেছে। বড়লেখা উপজেলায় আগর গাছে লোহার পেরেক ঢুকিয়ে ক্ষত সৃষ্টির মাধ্যমে সনাতন পদ্ধতিতে যে সুগন্ধি তৈরি করা হয় তা মোটেই উৎকৃষ্ট মানের নয়। ফলে বাজার মূল্যও কম। বড়লেখায় আগর উড থেকে সনাতন পদ্ধতিতে সুগন্ধি তৈরি করার বেশ কয়েকটি কারখানা রয়েছে। যার মাধ্যমে পাতন প্রক্রিয়ায় আগর তেল বা সুগন্ধি তৈরি করা হয়।

 

 

বন বিভাগর মাধ্যমে দেশের কিছু এলাকায় আগর বাগান সৃজণ করা করা হয়েছে। তাছাড়া চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে ব্রাক এর নিজস্ব বাগানে ২০০৭ সাল থেকে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বল্প সময়ের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে আগর উড সংগ্রহের লক্ষ্যে আগর প্লান্টেশন এর একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে জানা যায়।

 

 

চাষ প্রনালীঃ

মাটিঃ সুনিষ্কাশিত উচু জমি থেকে পাহাড়ী ভূমি।

 

 

সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৭৫০ মিটার বা প্রায় ২৫০০ ফুট উচ্চতা পর্যন্ত আগরের আবাদ করা যেতে পারে। অতিরিক্ত হালকা বুনটের মাটি ছাড়া সব ধরণের মাটিতে আগর জন্মায়। মাটির প্রতিক্রিয়া ৪.০-৬.০, গড় বৃষ্টিপাত ২০০০ সেন্টিমিটারের কম এবং ২৭-৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা আগর চাষের জন্য উপযোগী। অম্লীয় মাটি আগর গাছের সাথে সম্পর্কিত জীবাণুর উপযোগী আবাসস্থল বলে মনে করা হয়। আগর গাছ পাহাড় বা টিলার পর্যাপ্ত মাটিতেও জন্মানো যায়। ফলে মৃত্তিকায় ও ভূমি ধ্বস নিয়ন্ত্রণে এ গাছ ব্যবহার করা যায়।

 

 

চারা তৈরিঃ আগর গাছের ফল এক ধরণের ক্যাপসুল। রং গাঢ় বাদামী, ১.৫-২.০ ইঞ্চি লম্বা। প্রতি ফলে দু’টি বীজ থাকে। বীজের অংকুরোদগম মতা স্বল্প সময়ের জন্য অর্থাৎ ৭-১০ দিন স্থায়ী হয়। বীজ থেকে চারা তৈরি করা হয়। প্রথমে বালুর বেডে চারা তৈরি করা হয়, যা পরবর্তীতে পলিব্যাগে স্থানান্তরিত করা হয়। সাধারণত: বীজ গজানোর ২৫ দিন পর স্থানান্তরের কাজ করা হয়। চারার জন্য অস্থায়ী শেডের ব্যবস্থা রাখতে হয়। চারায় প্রয়োজনমত পানি দিতে হয়।

 

 

চারা রোপনঃ বর্ষা মৌসুম রোপণের উপযুক্ত সময়। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে রোপণ করা হলে চারা টিকে বেশি। স্কুল, কলেজ, পার্ক, রাস্তা, পুকুর বা খালের পাড় এমনকি আবাসিক এলাকায় আগর গাছ রোপণ করা যায়। সামাজিক বনায়নের আওতায় আগর বাগান সৃজণের যথেষ্ঠ সুযোগ রয়েছে। জুম চাষের পর পরিত্যাক্ত পর্যাপ্ত পাহাড়ের পুনর্বাসনে আগর আবাদের সম্ভাব্যতা যাচাই করা যেতে পারে।

 

 

১.৮মি: ী ১.৮মি: (৬ ফুট ী ৬ফুট), ৩মি: ী ৩মি: (১০ফুট ী ১০ফুট), ৩মি: ী ৪.৫মি: (১০ফুট ী ১৫ফুট) ইত্যাদি দূরত্ব বজায় রেখে চারা রোপণ করা যেতে পারে। এককভাবে চাষাবাদের ক্ষেত্রে কম দূরত্ব এবং মিশ্র বাগান বা আন্ত: ফসল আবাদের ক্ষেত্রে বেশি দূরত্ব বজায় রাখা আবশ্যক। গর্তের আকার ৫০সেমি: ী ৫০সেমি: ী ৫০সেমি: বা ২০ ইঞ্চি ী ২০ ইঞ্চি ী ২০ ইঞ্চি হওয়া আবশ্যক। চারা রোপণের সময় সম্ভব হলে প্রতি গর্তে ১৫ কেজি গোবর মাটির সাথে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে।

 

 

মিশ্র বাগান বা আন্ত: ফসলঃ প্রথম ৩-৫ বছর আগর বাগানে আন্ত: ফসল হিসেবে শাকসব্জি ও ডাল ফসলের আবাদ করা যায়। পরবর্তী কয়েক বছর ছায়া পছন্দকারী ঔষধি গাছ হিসেবে স্বর্পগন্ধার আবাদ করা যায়। সমতল ভূমি হলে ২/১ বছরের জন্য আদা হলুদের আবাদ করা যেতে পারে।

 

 

তবে গাছের গোড়ায় ৫০ সেমি: বা ২০ ইঞ্চি জায়গা খালি রাখা আবশ্যক। আগর গাছ কৃষি বনায়নের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। মিশ্র বাগান কিংবা আন্ত: ফসল আবাদের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে খাপ খাওয়ানোর এক বিস্ময়কর মতা রয়েছে আগর গাছের। কফি, সুপারি, রাবার, পামসহ অধিকাংশ বনজ গাছের সাথে মিশ্র আবাদের ক্ষেত্রে আগর বেশ উপযোগী। আগর বাগানে মিশ্র ফসল হিসাবে এলাচিরও আবাদ হয়ে থাকে। ভারতে ছায়া প্রদানকারী বৃক্ষ হিসাবে চা বাগানেও আগরের আবাদ করা হচ্ছে।

 

 

সার প্রয়োগঃ ভার্জিন বা নবীন বনভূমিতে আগরের বাগান করতে তেমন কোন সার প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না। অন্যান্য ক্ষেত্রে চারা রোপনের সময় জৈব সার প্রয়োগ করার পর ১ম বছর কোন রাসায়নিক সার প্রয়োগের প্রয়োজন নেই। ২ য় বছর থেকে নিম্নের হারে সার প্রয়োগ করা আবশ্যক। সমুদয় সার দুই ভাগে ভাগ করে বর্ষা মৌসুমের আগে ও পরে প্রয়োগ করা আবশ্যক।

 

 

আগর উড সংগ্রহঃ মজার ব্যাপার হলো আগর উড সংগ্রহের জন্য গাছ কর্তনের উপযোগী হয়েছে কীনা তা যাচাই করা হয় গাছটি কতটুকু রূগ্ন বা রূগ্ন হলে কত বেশি রূগ্ন তা বিচার করে। ধরে নেওয়া হয় সুস্থ গাছে জীবাণু সংক্রমণ ঘটে না বলে তা থেকে আগর উড পাওয়া যায় না। তাই আগর উড সংগ্রহের ক্ষেত্রে সুস্থ গাছ কর্তন করা হয় না।

 

 

পরবর্তীতে আক্রান্ত হলে আগর উড পাওয়া যাবে এই আশায় বাগানে রেখে দেওয়া হয়। পূর্বেই বলা হয়েছে বয়স, গাছের বৃদ্ধি কিংবা শারীরবৃত্ত্বীয় পরিপক্কতা ইত্যাদির উপর বাণিজ্যিকভাবে আগর উড সংগ্রহের জন্য গাছ কর্তনের উপযোগীতা নির্ভর করে না।

 

 

যথেষ্ট সংক্রমিত হয়ে গাছের বৃদ্ধি থেমে যাওয়া, দৃশ্যমান ক্ষতযুক্ত কান্ড, কান্ডের বিকৃতি, ক্ষুদ্র পাতা, মূল কান্ড ও শাখায় উপর থেকে মরা (Die back) লক্ষণ ইত্যাদি দেখে আগর উড সংগ্রহের জন্য আগর গাছ কর্তন করা হয়। যদিও সারা বছর আগর উড সংগ্রহ করা যায়। তবে শুষ্ক মৌসুম অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস আগর উড সংগ্রহের উত্তম সময়। কারণ এই সময় গাছ সুপ্ত অবস্থায় থাকে বলে বেশি মাত্রায় ও উৎকৃষ্ট মানের সুগন্ধি পাওয়া যায়। একটি আগর গাছ থেকে গড়পড়তা ২.০-২.৫ কেজি আগর উড পাওয়া সম্ভব।

 

 

বাংলাদেশে আগর চাষের সমস্যাঃ

-আগর চাষ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আধুনিক কারিগরী জ্ঞানের অভাব।

-সনাতন চাষ পদ্ধতি ও নিম্ন মানের পণ্য।

-অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য ও উচ্চ রপ্তানি শুল্ক।

-আগর শিল্পের বিকাশ ও উন্নয়নে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব।

 

 

বাংলাদেশে আগর চাষ সম্প্রসারণে করণীয়ঃ

-সরকারিভাবে আগর চাষীদের প্রশিক্ষণের সুবিধা সৃষ্টি করা এবং আগর থেকে বিশ্বমানের বহুবিধ পন্য উৎপাদনের বিষয়ে তাদের দক্ষ করে তোলা।

-আগরজাত পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বর্তমান অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের পরিবর্তে আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যে চালু করা।

-আগর রপ্তানীর ক্ষেত্রে উচ্চ শুল্ক বাঁধা অপসারণ করা।

-সরকারী বনের আগর গাছ বিক্রির ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রক্রিজাতকরণ শিল্পের স্বার্থ সংরক্ষণের মাধ্যমে এই শিল্পের ফরোয়ার্ড লিংকেজকে শক্তিশালী করে কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ প্রশস্ত করা।

-প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ব বাজারে স্থান করে নেওয়ার জন্য আগর চাষীদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করা।

 

 

বাংলাদেশে আগরের সম্ভাবনাঃ বাংলাদেশের সিলেট, চট্টগাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে আগর চাষের জন্য উপযোগী ভূমি রয়েছে এবং বর্তমানে সেখানে আগরের আবাদ হচ্ছে। সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে কৃত্রিম উপায়ে আগর গাছে সংক্রমণের আধুনিক প্রযুক্তির প্রবর্তন করা গেলে এবং আগর তেলসহ অন্যান্য আগরজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা সম্ভব হলে আগর শিল্পে বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করতে পারে।

 

 

উন্নত প্রযুক্তির বিষয়ে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ভারত প্রভৃতি দেশের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। উন্নত পদ্ধতিতে আগর চাষ অত্যন্ত লাভজনক বিধায় সরকারি পলিসি সাপোর্ট ও পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া গেলে এ খাতে বিনিয়োগের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

 

 

ফলে আগর শিল্প বাংলাদেশে একটি অন্যতম বৈদেশিক মূদ্রা অর্জনকারী খাত হিসেবে স্থান করে নিবে। স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠা আগর প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলোকে এ শিল্পের ফরোয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে ব্যবহার করার লক্ষ্যে বন বিভাগের আগর বাগান বিক্রির ক্ষেত্রে স্থানীয় কারখানা ও দক্ষ জনবলের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আগর শিল্পের বিশেষত্ব হলো- এ শিল্প জ্বালানী নির্ভর নয় এবং এর জন্য অবকাঠামোগত চাহিদা নেই বললেই চলে।

 

 

এই শিল্প পরিবেশ বান্ধব অর্থাৎ এই শিল্পের মাধ্যমে গ্রিণ হাউস গ্যাস কমানো যায়। আগর শিল্প সম্পূর্ন রপ্তানিমুখী ও লাভজনক। ব্রাকের এক গবেষণা প্রতিবেদনে আগর প্লান্টেশনে বিনিয়োগের উচ্চ মুনাফার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

 

 

যার সংক্ষিপ্ত সার হলো সঞ্চয়পত্রে ১ ডলার বিনিয়োগ করা হলে ১২ বছরে ৪.২১ ডলার পাওয়া যায় অথচ আগর প্লান্টেশনে ১ ডলার বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগকারী একই সময়ে ১১৭.২০-৭৩৬.৮০ ডলার আশা করতে পারেন। বাংলাদেশে যারা বংশ পরম্পরায় আগর চাষের সাথে জড়িত, তাদের উন্নত প্রযুক্তি ও সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার আওতায় এনে এ শিল্পকে দ্রূত সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

 

 

শেষ কথাঃ কৃষি প্রধান বাংলাদেশে আগর একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় অথচ অবিকশিত শিল্প। সরকারি পলিসি প্লানিং এর আওতায় সম্ভাব্য এলাকায় এর চাষ সম্প্রসারণ, চাষ ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রমকে আধুনিক ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে আসা এবং ব্যক্তির পরিবর্তে সরকারি উদ্যোগে প্রধান প্রধান আগর রপ্তানিকারক দেশে বাংলাদেশের আগরজাত পন্য প্রবেশের অনুকূল পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে এ শিল্পের বদ্ধ জানালা খুলে দিয়ে আশু এ সেক্টরে অপার সম্ভাবনার আলোকছটা প্রবেশের পথ সুগম করতে হবে।

 

 

লেখক ঃ

* প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, সিলেট

** বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, জামালপুর

Add a Comment

Your email address will not be published.

CAPTCHA